সর্বশেষ

27.6 C
Rajshahi
বুধবার, জুলাই ২৪, ২০২৪

দেশের টাকা কোথায় ঢালছে আমানা গ্রুপ

টপ নিউজ ডেস্ক: ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফার টোপ দিয়ে বিনিয়োগের নামে সারা দেশের গ্রাহকের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা তুলে নেয় আমানা গ্রুপ। তবে সেই টাকা দেশের কোনো কাজে আসেনি। পাচার হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ওই দেশে নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা পাচারের। জানা গেছে তাদের এই কর্মকাণ্ডে একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির জড়িত থাকার কথাও। অর্থ পাচারসহ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষার জন্য গ্রুপটি নিজেদের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করেছে দেশের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরও।

আমানা গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) যথাযথ অনুমতি না নিয়েই তারা যুক্তরাজ্যে একটি লিমিটেড কোম্পানি খুলে বসেছে ওই পাকিস্তানি সহযোগীর মাধ্যমে। বিদেশে কোম্পানি চালু করার কথা স্বীকার করলেও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর জন্য নাকি তাদের কোনো বিনিয়োগই করতে হয়নি সেখানে। এমনকি তাদের অফিস স্পেসের ভাড়াও ‘অন্য কেউ’ পরিশোধ করছেন।

রাজশাহীতে আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত আমানা গ্রুপ সম্প্রতি ‘ইন্দো-বাংলা’ ও ‘সিবন্ড শিপিং’ এলএলসি নামের আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির অংশীদার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে গ্রুপটি অর্থ পাচারে জড়িয়ে পড়েছে কি না এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মানি লল্ডারিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অনেক বড় বড় ব্যক্তি জড়িত থাকেন। তাই তাদের বিষয়ে কথা বলাও নিরাপদ নয়। অতীতে দেশে ঘটনা ঘটেছে ইভ্যালি বা যুবকের মতো প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের প্রতারণার। সেগুলো বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া আমানা গ্রুপ যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে, যথেষ্ট কারণ রয়েছে সেটা নিয়েও উদ্বিগ্ন হওয়ার। তিনি মনে করেন, খুব দ্রুত কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত বিষয়টি।

আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না থাকার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমানা গ্রুপের পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে সাজালে বিষয়টিকে খুব সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশে বিপুল অর্থ সংগ্রহকারী একটি প্রতিষ্ঠান, যার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা হঠাৎ করে নামসর্বস্ব বিদেশি কোম্পানির পরিচালক হওয়ার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিকারক হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন। বিষয়টি ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের দেওয়া সতর্কসংকেতগুলোর প্রথম দুটি সংকেতের মধ্যে পড়ছে। এর সঙ্গে নিজস্ব শিপিং কোম্পানি গঠন এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নেপথ্য সংযোগ একই গাইডলাইনের ৪, ৩৩ ও ৩৭ নম্বর সতর্কসংকেতের আওতায় আসে।

বিনিয়োগের নামে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহ

অনুসন্ধানে জানা যায়, আমানা গ্রুপ ২০১৭ সাল থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ সংগ্রহ শুরু করে। বিনিয়োগকারীদের ভাগ করা হয় দুই ভাগে। শেয়ার ডিভিডেন্ড একটির নাম দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয় প্রতি লাখে ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার কথা। তিন ধরনের বিনিয়োগকারীকে রাখা হয় অন্য ভাগে। এক থেকে দুই বছর মেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৩ শতাংশ, ১৪ শতাংশ ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য, আর ৬ বছর ও তার বেশি মেয়াদের বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৫ শতাংশ হারে উল্লেখ করা হয় মুনাফা দেওয়ার কথা। ২০২৩ সাল নাগাদ ৫ শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি নানা মেয়াদে সংগ্রহ করে বিভিন্ন অঙ্কের আমানত। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা এই বিনিয়োগের পরিমাণ। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক (ইডি) আবু সাঈদ চৌধুরীর দেওয়া তথ্য মতে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রেখেছেপ্রায় পৌনে দুশ কোটি টাকা আমানা গ্রুপ । যার কয়েকটি কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক ঋণের বিষয়টি জানালেও সারা দেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি ওই কর্মকর্তা।

যুক্তরাজ্যের কোম্পানিতে আমানার রহস্যজনক সংশ্লিষ্টতা

অনুসন্ধানে আমানা গ্রুপ সম্প্রতি যেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে সেগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান, দুবাই, ভারত ও আফগান ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি হাউসের নথিপত্র থেকে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর ব্রিটেনে পাকিস্তানি নাগরিক তাহির রউফ একক পরিচালক হিসেবে ‘অ্যাপোলো নোভা লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানির নিবন্ধন নেন। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তা বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেন। এক পাউন্ড স্টার্লিং মূলধনে প্রতিষ্ঠিত তার এই কোম্পানির নাম ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বদলে রাখা হয় ‘অ্যাপোলো নোভা ক্যাপিটাল লিমিটেড’।

একই বছরের এপ্রিলে রয় পল মিলার নামে এক ব্রিটিশ নাগরিককে মাত্র তিন মাসের জন্য কোম্পানির পরিচালক করেন তাহির। যিনি আরও অন্তত চারটি কোম্পানির পরিচালক। বেআইনি তৎপরতার অভিযোগে সম্প্রতি ব্রিটেনের কোম্পানি হাউস মিলারের চারটির মধ্যে দুটি কোম্পানিকে ‘স্ট্রাইক অফ’ করার প্রস্তাব করে। মিলারের কোম্পানি পরিচালনার তথ্যে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন কম্পানির মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগান নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব স্থাপন করেছেন। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর এই অ্যাপোলো নোভা ক্যাপিটাল লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে যুক্ত হন বাংলাদেশের আমানা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম, ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মাসুদুল হক ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (ইডি) আবু সাঈদ চৌধুরী। তিন দিনের মাথায় কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আমানা বিগ বাজার লিমিটেড’। কোম্পানি নম্বর ১৩০৯৩১৭৩। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ঠিকানা ইংল্যান্ডের অক্সটেড শহরের ইডেন প্লেসের হার্ডউইক হাউসের ৫ নম্বর অ্যাপার্টমেন্ট। পূর্ববর্তী পরিচালক পাকিস্তানি নাগরিক তাহির রউফ বর্তমানে কোম্পানির সেক্রেটারি পদে কর্মরত।

এদিকে চলতি বছরের ২ মে একই ঠিকানায় আরও একটি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে, যার নাম সুইস মার্স গ্রুপ লিমিটেড। তাহির রউফের সঙ্গে এই কোম্পানির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আমানা গ্রুপের ইডি আবু সাঈদ চৌধুরী। কোম্পানির অনুমোদিত ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে বলা হয়েছে, তারা নিজস্ব রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করবে। আর এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ব্রিটেনে আর্থিক বিনিয়োগ কিংবা সম্পদ না থাকলে আমান গ্রুপ সেখানে কীভাবে ‘নিজস্ব রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসা পরিচালনা করবে?

অ্যাপোলো নোভার পূর্বের ঠিকানায় আরও একটি নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে নিবন্ধিত তাহির রউফের সেই কোম্পানির নাম ওয়েস্টমুন ক্যাপিটাল এলএলপি। তার সঙ্গে রয়েছেন নওশিনা মোবারিক। যিনি একজন প্রভাবশালী স্কটিশ রাজনীতিবিদ পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। যিনি কনজারভেটিভ পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ব্রিটেনের হাউস অব লর্ডসের সদস্য। হাউস অব লর্ডসের নথিপত্রে দেখা যায়, নওশিনা মোবারিক এই ওয়েস্টমুন ক্যাপিটাল এলএলপির সঙ্গে পরিচালক হিসেবে সম্পৃক্ত। সেখানে রেজিস্ট্রার অব ইন্টারেস্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে, তিনি পাকিস্তান ও ব্রিটেনের মধ্যে ক্রসবর্ডার বিনিয়োগে সহায়তা করে থাকেন তার কোম্পানির মাধ্যমে।

এ ছাড়া ড. এমএএ সরদার আমানার বিনিয়োগকৃত আন্তর্জাতিক শিপিং প্রতিষ্ঠান সিবন্ড শিপিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যিনি ভারতীয় নাগরিক এবং নিজেকে পরিচয় দেন ট্রান্সপোর্ট ইকোনমিস্ট হিসেবে। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে রিভার এজ শিপিং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির পরিচালক তিনি। তার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে মুহাম্মদ জাফর হাবিবের, দুবাইয়ে বসবাসরত আরেক পাকিস্তানি নাগরিক । সিবন্ড শিপিংয়ের ডোমেইন নেম তার নামেই রেজিস্ট্রি করা। তিনি ব্রিটেনে তিনটি শিপিং কোম্পানি খোলেন বেশ কয়েক বছর আগে। যার একটি বিলুপ্ত করেন নিজেই। অপর দুটি সঠিক আর্থিক হিসাব দেখাতে না পারায় বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ কোম্পানি হাউস।

শিপিং ও পোর্ট ব্যবসায় আমানাকে সঙ্গে নিয়ে প্রভাবশালীদের বিনিয়োগ

চোখে পড়ার মতো বিষয় হচ্ছে, কেবল বিদেশে নয় দেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত একাধিক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিতে অনেকেই আমানা গ্রুপকে সঙ্গে নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। যার মধ্যে রয়েছেন বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) আবুল হোসেন।

সিবন্ড শিপিংয়ের মতো আমানার বিনিয়োগ রয়েছে ইন্দো-বাংলা শিপিং, রাজশাহী পোর্ট পিএলসি এবং সুলতানগঞ্জ পোর্ট পিএলসিতে। এসব প্রতিষ্ঠানে অংশীদারদের তালিকায় রয়েছেন- রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, স্ত্রী শাহীন আক্তার রেনী মেয়রের, ডা. আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা তাদের মেয়ে এবং মেয়রের ব্যবসায়িক পার্টনার মো. শামসুজ্জামান আউয়াল, অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল আবুল হোসেন ও ভারতীয় নাগরিক ড. এমএএ সরদার।

তবে সিবন্ড শিপিংয়ের গভর্নিং বডির অন্যতম সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল আবুল হোসেন বুধবার জানান, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বা আমানা গ্রুপ কেউই এখন আর সংশ্লিষ্ট নেই। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে তাদের পর্ষদ এখনও কার্যকর দেখাচ্ছে- এমন তথ্য তুলে ধরা হলে তিনি উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরে অনেকবার তাকে ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।

বাংলাদেশের যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধকের কার্যালয়ের নথিপত্র থেকে জানা যায়, দেশে আমানা গ্রুপের ১২টি কোম্পানি রয়েছে। যদিও এর সবকটির অস্তিত্ব আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চেয়ারম্যান, এমডি, ইডি ছাড়াও এই গ্রুপে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহীন আকতার রেনীসহ আরও ৮ জন পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে শাহীন আকতার রেনীর মোবাইল নম্বরে কল করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, সমালোচনার মুখে শাহীন আকতার রেনী ওই প্রতিষ্ঠান থেকে সরে এসেছেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। রাসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত ২৯ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত আমানা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুল করিমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা এবং মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মাসুদুল হকের নম্বরে কল করার পাশাপাশি প্রশ্নসমেত মেসেজ পাঠানো হলে তিনি উত্তরে জানান, আমি হজে এসেছি ভাই, আপনার নম্বরটা পরিচিত নয়, তাই হয়তো রিসিভ করা হয়নি।

তবে ব্রিটেনে তাদের কোম্পানির অস্তিত্বের কথা প্রতিষ্ঠানটির একটি সূত্র স্বীকার করলেও তাহির রউফসহ পাকিস্তান বা আফগান সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর সঙ্গে অস্বীকার করেছেন তাদের সম্পৃক্ততা। সূত্রটি আরও জানায়, বিদেশে কোম্পানির বিষয়টি তাদের প্রতিষ্ঠানের ইডি আবু সাঈদ চৌধুরী দেখভাল করছেন।

এদিকে আমানা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পদে থাকলেও আমানার ব্যবসার ধরন ও দেশের মধ্যে তাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বলে জানান আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমার কাজ তাদেরকে বিদেশ থেকে ফান্ড সংগ্রহের বিষয়ে সহযোগিতা করা। পাশাপাশি সহযোগিতা করা প্রতিষ্ঠানটি দেশে ফুড প্রসেসিং ও এগ্রি বেজড কেমিক্যাল কোম্পানি চালু করলে তাদের ইউরোপ থেকে কোম্পানির জন্য মেশিনারিজ আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির বিষয়ে। আমানা গ্রুপের ১৭০ থেকে ১৮০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে বেশ কিছু কিস্তি সম্ভব হয়নি সময়মতো পরিশোধ করা। অর্থ সংগ্রহ করা হবে বিদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে বন্ডের মাধ্যমে।

ব্রিটেনে চালু করা আমানা বিগ বাজার লিমিটেডের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিডার কাছ থেকে প্রাথমিক কোনো অনুমতি না নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এই কর্মকর্তা জানান, ব্যবসা শুরু করলে অনুমতি নেওয়া হবে।

আবু সাঈদ চৌধুরী ব্রিটেনে বিনিয়োগের কথা অস্বীকার করলেও, হার্ডউইক হাউসের যে অ্যাপার্টমেন্টটিকে তাদের কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেটি একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট। ৮১৭ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ টাকা।

পাকিস্তানি নাগরিক তাহির রউফের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আবু সাঈদ বলেন, জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠানে থাকাকালে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। তিনি মূলত বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রজেক্টের ফান্ড কালেক্ট করে দেওয়ার কাজ করে থাকেন। সেখান থেকে তিনি কমিশন নেন। তাহির ৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি ফান্ড জোগাড় করে দিতে চেয়েছেন। তবে সুদের হার বেশি চাওয়ায় আমরা ফান্ড নিইনি।

অবশ্য তাহির রউফ কোথা থেকে এই ফান্ড সংগ্রহ করছে এ বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

সিবন্ড শিপিংয়ে নিজের কোনো শেয়ার নেই বলে দাবি করেন আবু সাঈদ। এ সময় তাকে কোম্পানির ওয়েবসাইটে থাকা গভর্নিং বডির তথ্য দেওয়া হলে তিনি জানান এসব ভুয়া। তবে তিনি খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে রাজশাহী পোর্ট ও সুলতানগঞ্জ পোর্টে তার ব্যবসার অংশীদারত্ব থাকার কথা জানান।

প্রতারণার আরেক ফাঁদ উত্তরায়ণ আমানা সিটি

মাইলের পর মাইল কৃষিজমি, নয়তো জলাশয়। যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ নওহাটা পশুর হাটের (সিটি হাট) উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বের চিত্র এটি। এসব জমির পুরোটাই ব্যক্তিমালিকানাধীন, কিছু কিছু সরকারি। এসব জমিতে বহু যুগ ধরে চাষাবাদ করে খাচ্ছেন জমির মালিকরা। আর অন্যের সেই জমি নিজেদের দেখিয়ে কয়েক বছর আগে থেকে ‘উত্তরায়ণ আমানা সিটি’ নামের আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে আমানা গ্রুপ। অনেক দিন ধরেই এই প্রকল্পে প্লট বুকিং নেওয়া চলছে। শুরুতে সামান্য কিছু জমি কিনে ধীরে ধীরে প্রায় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার বিঘা ফসলি জমিতে কোম্পানিটি আবাসন প্রকল্পের কাল্পনিক নকশাও দাঁড় করিয়েছে। প্লট বুকিংয়ের নামে তুলে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। নকশায় দেখানো হয়েছেÑ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং রাসিকের প্রশস্ত সড়ক ঘিরে রয়েছে এই প্রকল্পের চতুর্দিক। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা থাকলেও আমানা গ্রুপ তাদের প্রতারণার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়িক অংশীদার বানিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের।

নগরীর সিটি হাট এলাকায় যাদের জমি নকশায় দেখিয়ে প্লট বুকিং শুরু করে উত্তরায়ণ আমানা সিটি ওইসব জমির মালিকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের জমি দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কোম্পানিটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। এ নিয়ে জমির প্রকৃত মালিকরা অভিযোগও করেছেন প্রশাসনের কাছে। আরও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখনও প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম।

আবাসন প্রকল্পের নকশায় প্রায় ছয় হাজার বিঘা জমি দেখিয়েছে আমানা গ্রুপ। যার মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের জমি রয়েছে। তবে তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। যেসব গ্রাহক উত্তরায়ণ আমানা সিটি আবাসন প্রকল্পে শুধু নকশা দেখে প্লট বুকিং দিয়ে মাসে মাসে কিস্তি দিয়ে যাচ্ছেন, তারা প্রতারিত হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ক্যাব। সংস্থাটির অভিযোগ, কোম্পানি থেকে প্রতারিত হতে পারেন এমন আশঙ্কায় অনেক গ্রাহক জমি বুকিংয়ের অর্থ ফেরত চাইলেও উত্তরায়ণ আমানা সিটি কর্তৃপক্ষ কাউকে টাকা ফেরত দিচ্ছে না। উল্টো তাদের ঘোরানো হচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার অন্তত ৮ জন গ্রাহক রয়েছেন, যারা প্লট বুঝে না পেয়ে এবং প্রকল্প নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় তাদের টাকা ফেরত নিয়েছেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা জানান, টাকা দিয়েও প্লট বুঝে না পাওয়ায় এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরে গত বছরের অক্টোবর মাসে বুকিং মানি ফেরত চান তারা। তবে নানা অজুহাতে তাদের অনেক দিন ঘোরানো হয়েছে। অনেককে ধরাধরি করার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে তারা টাকা আদায় করতে সক্ষম হন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রজেক্টে রাসিক মেয়র লিটনের স্ত্রী শাহীন আকতার রেনী তাদের চেয়ারম্যান। ক্রেতাদের কাছে এই নামটাই তারা বেশি বলে। নওহাটা এলাকার তারা সামান্য কিছু জমি কিনে রাজশাহী সিটি হাট এলাকায় প্রকল্পের সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি ক্যাব-এর রাজশাহী শাখার পক্ষ থেকে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আমানা গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এর কপি দেওয়া হয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও দুদক চেয়ারম্যানকে।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হচ্ছে, কেউ আবাসিক প্রকল্প করতে চাইলে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তারা জমির শ্রেণি দেখবেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিজমি ও জলাধারের বিষয়ে। আবাসন প্রকল্পের জন্য আমানা গ্রুপ তাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, আমানা গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নগরীর উপকণ্ঠ নওদাপাড়া এলাকায় জমি ক্রয় করতে চেয়েছে। যে কেউই জমি কিনতে পারে। তবে কাউকে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আগামীতেও হবে না। এমনকি কাউকে আবাসিক প্রকল্প করার জন্য কোনো অনুমতিই দেওয়া হয়নি।

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, তিনি ক্যাবের স্মারকলিপিটি পেয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসককে তদন্তের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তিন ফসলি জমিতে এভাবে আবাসন প্রকল্প তৈরির কোনো সুযোগ নেই।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles