নওগাঁর ৩০ভাগ গ্রামীন নারী কৃষি অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত

0
59

রুবেল হোসেন,নওগাঁ : নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার আদিবাসি পাড়ার মিনু মরমু দুই ছেলে সন্তানের মা। এক ছেলে অষ্টম শ্রেনীতে আরেক ছেলে পড়াশোনা করছেন পঞ্চম শ্রেনীতে। স্বামী পেশায় একজন ভ্যান চালক। সংসারের খরচ যোগাতে ও বাড়তি আয়ের যোগান দিতে জমিতে আমন ধানের চারা রোপনের কাজ করছেন ১২জনের একটি দলের সাথে। মিনু মনে করেন সৎভাবে সকল কাজই তার কাছে গৌরবের।

বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যানকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর। আমাদের প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নারী কবিতায় এই মহান বানী প্রতিটি মানুষের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস। শুধু তাই নয়,পুরুষদের কাছে স্পৃহা বা উদ্দীপনাও বাড়ায় । হতে পারে সে কখনো তার মা,তার বোন, ভালো কোন বন্ধু, প্রেয়সী আবার কখনো স্ত্রী।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কৃষি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গ্রামীণ উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল। দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন, যাদের জীবিকা কৃষি থেকে আসে। উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় প্রায় ৩০ভাগ নারী কৃষি অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষির বিভিন্ন কর্মকান্ড বিশেষ করে শস্য কর্তনোত্তর ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বীজ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি ও ফল উৎপাদন, সামাজিক বনায়ন ইত্যাদিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কেউবা বাড়ির উঠানে সবজি চাষ করেছেন, কেউবা আবার হাঁস-মারগী পালন করছেন। আবার কেউবা জমিতে ধান লাগানোর কাজ করছেন। নওগাঁর এসব গ্রামীন নারীরা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষি এবং কৃষিতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান দুটিতেই সমান ভূমিকা রাখছেন। টেকসই কৃষি যেমন নারীর হাতে, তেমনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও নারীর হাতে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীর অংশগ্রহণ যেমন অত্যাবশ্যক, ঠিক তেমনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও নারীর সরাসরি সম্পৃক্ততার সৃষ্টি হয়েছে।

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার সরাইল মাঠে ধান রোপন করছেন ১২জন নারী, তাদের দলনেতা হানিফ উদ্দিন নামের এক শ্রমিক। মাথার উপর তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে পুরুষ শ্রমিকদের মতই সমান তালে ধান রোপন করে যাচ্ছেন এসব গ্রামীন নারী শ্রমিকরা।

এসময় কথা হয় মিনু মরমু নামের এক নারী শ্রমিকের সাথে, মিনু বলেন, হামার সংসারে দুই সন্তান ও স্বামী আছে। স্বামীডা হামার ভ্যান চালায় আর হামি নারী শ্রমিকের কাম করি। আমন মৌসুম চলিচ্ছে। তাই ধান লাগানার কাম করিচ্ছি। প্রতি বিঘা ধান লাগানা ১৫০০টাকা করা। প্রতিদিন হামরা ৫বিঘার মত ধান লাগাই। দিন শেষে একেকজন ৬৫০/৭০০ টেক্যার মত করা পাই। দুই সন্তান স্কুলে পড়া-লেকা করে। তারকোক বড় করা তুলা চাকুরি করামু।

মাইজি মরমু নামের নারী শ্রমিক বলেন, একন ধান লাগানার কাম করিচ্ছি। অন্য সময়গুলাত রাইসমিলোত, রাস্তাত মাটি কাটাসহ নানা কাম করা থাকি। কাম করা হামাকে সংসারের খরচ যোগায়। এ ছাড়া হামাকে বাড়ির উঠানোত সবজি বাগান আছে। হাঁস – মুরগিও লালন পালন করা থাকি হামরা।

দলনেতা হানিফ উদ্দিন বলেন, আমার মোট ১৩জন ধান রোপন এর কাজ করছি। আমি ছাড়া সবাই নারী। কাজ করে যা টাকা পাই তা সবাই সমান করেই ভাগ করে নেই। আমাদের মাঝে কাজের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা বা ঝামেলা হয়না।
জেলার রাণীনগর উপজেলার কুজাইল গ্রামের মাঠে পরিবারের সদস্যদের সাথে ক্ষেত থেকে গম সংগ্রহের কাজ করছেন জুলেখা বেগম। কথা হলে জুলেখা বলেন, স্বামী ও সন্তানদের সাথে ক্ষেত ত্যাকা হামি গম তোলার কামে সহযোগিতা করিচ্ছি। গমের বীজ যখন লাগান হয় তকনও হামি পরিবারের সাথে থ্যাকা সহযোগিতা করিছি। সংসারের কামের পাশাপাশি নানা ধরনের কৃষি ফসল ফলান ও উৎপাদনে স্বামী ও সন্তানোক নানাভাবে সহযোগিতা করা থাকি। সবাই মিলা-মিশা তাতে করা কামগুলা সহজে করা যায়।

নওগাঁ শহরের মুন্সিপাড়া মহল্লার গৃহিনী পারভিন আক্তার তার বাড়ির ছাঁদে সবজি,ফুল,ফলসহ প্রায় ২৫রকমের চারা রোপন করেছেন। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকেন। এমনকি প্রতিবেশিদেরও উপহার দেন।

পারভিন বলেন, নারীরা সব দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সকল ক্ষেত্রে নারীরা অগ্রহী ভূমিকা রাখছেন। বাড়ির ছাঁদ খালি পড়েছিল, যার কারনে গত ২বছর আগে আমি ছাঁদ বাগান গড়ে তুলেছি। এসব বাগান থেকে সবজি ও ফল নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করছি। এছাড়া প্রতিবেশিদেরও দিয়ে থাকি। এসব গাছ লাগানোর কারনে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা হচ্ছে। গ্রাম কিম্বা শহর সবখানেই উচিত নারীদের কৃষিতে ভূমিকা রাখা।

নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান নিউজবাংলাকে বলেন, নওগাঁর কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। ফসল উৎপাদনে মাঠের কাজের পাশাপাশি মাঠের বাইরে উৎপাদন কাজেও নারীরা ভূমিকা রাখছেন। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত রয়েছে নারীর অবদান। গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কাজের সুযোগের অভাব থাকায় অনেক পুরুষ গ্রাম থেকে শহরে কাজের সন্ধানে চলে যায়। এর ফলে গ্রামীণ কৃষি ক্ষেত্রে কখনও চাষি হিসাবে, কখনও শ্রমিক হিসাবে আবার কখনও উদ্যোগতা হিসেবে নারীরা নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। চাষ শুরুর সময় থেকে ফসল কাটা, মজুত করা এবং বাজারজাত করার সময় নওগাঁর নারীরা ভূমিকা রাখছেন। প্রফেসর শরিফুল আরও বলেন, এসব গ্রামীন নারীদের কৃষিখাতে ভূমিকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশি করে প্রশিক্ষন ও স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন। নারীদের জেলা পর্যায়ে কৃষিখাতে ভূমিকা রাখা ও উৎসাহিত করতে বিশেষ পুরষ্কার দেয়ার উদ্যোগ নিলে তারা আরও বেশি উৎসাহিত ও প্রাণবন্ত হবে বলে মনে করি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এ, কে, এম, মনজুরে মাওলা নিউজবাংলাকে বলেন, নওগাঁর জেলার প্রায় ৩০ভাগ নারী প্রত্যক্ষ ও প্ররোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বীজ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি ও ফল উৎপাদন, সামাজিক বনায়ন ইত্যাদিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে জেলার নারীরা। সংসারে বাড়তি আয়ের যোগান দিচ্ছেন কৃষিকাজ করে।

কৃষি বিভাগ থেকে গ্রামীন নারীদের কৃষি কাজে কি ধরনের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে দেয়া হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকতা বলেন, নারীদের কৃষি কাজে উৎসাহিত করার জন্য মাঠ দিবস, উঠান বৈঠক, নানা ধরনের ফসল, সবজি, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বীজ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ির আঙ্গিনায় সবজি ও ফল উৎপাদনসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করা হয়ে থাকে। এছাড়া জেলা,উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের কৃষি অফিস আছে সেখান থেকে গ্রামীন নারীরা সরাসরি কৃষি বিষয়ক নানা পরামর্শ পেয়ে থাকে।
পুরুষ এর পাশাপাশি নারীরা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। যা দেশের কৃষি অর্থনীতিকে সাফল্যমন্ডিত করেছে।

আপনার মন্তব্য