সর্বশেষ

29.2 C
Rajshahi
বুধবার, জুন ২৬, ২০২৪

ইয়াসমিন ট্রাজেডির ২৭তম বার্ষিকী আজ

টপ নিউজ ডেস্কঃ আজ ২৪ আগস্ট, দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ইয়াসমিন ট্রাজেডির ২৭তম বার্ষিকী আজ। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে একদল পুলিশ সদস্যের হাতে তরুণী ইয়াসমিন নিমর্মভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। দিনাজপুরের আমজনতা এই ঘটনার প্রতিবাদে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পুলিশ প্রতিবাদী মানুষকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সাতজন নিরীহ মানুষকে। যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। জনতার এই রোষানলে পড়ে কোতয়ালী থানা, ৪টি পুলিশ ফাঁড়ি, ডিএসবি অফিসসহ ভস্মিভূত হয় অনেক পুলিশের গাড়ি। এই ঘটনায় কোটি কোটি মানুষের নজরকাড়ে দিনাজপুর।

ইয়াসমিন ছিলো দিনাজপুর শহরের রামনগর মহল্লার এক দরিদ্র ঘরের কিশোরী কন্যা, কাজ করতো ঢাকার এক বাসায়। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে ইয়াসমিনকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামিয়ে দেয় ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজ নৈশ কোচের সুপারভাইজার এবং একজন চায়ের দোকানদারকে বলেন, সকালে যেন তাকে দিনাজপুর শহরগামী কোনো বাসে উঠিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা ইয়াসমিনকে চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে নানা প্রশ্ন করে এবং এক পর্যায়ে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে জোরপূর্বক তাকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেয়। এরপর তারা ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে দশমাইল সংলগ্ন সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে চলে যায় এবং পরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাকে ভাসমান পতিতা বানানোর চেষ্টা করে। সেইসাথে বেওয়ারিশ পরিচয়ে তড়িঘড়ি লাশ দাফন করে ফেলে।
এই ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। ২৬ আগস্ট রাতে কোতয়ালী থানা ঘেরাও করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জনতা। পরদিন সকালে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয় এবং সেদিন দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে কয়েক হাজার জনতা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিতে যায়। কিন্তু এসময় বিনা উস্কানিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে সাতজনকে নিহত হয়। সামু, কাদের ও সিরাজ নামক তিনজনের লাশ পাওয়া গেলেও পুলিশ বাকি ৪টি লাশ গুম করে ফেলে। এছাড়াও সেদিন আহত হয় প্রায় তিন শতাধিক। এ ঘটনায় শহরের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা, মোতায়েন করা হয় বিডিআর।

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি তিনটি আদালতে ১২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আবদুল মতিন মামলার রায় ঘোষিত রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পুলিশের পিকআপ ভ্যান চালক অমৃত লাল বর্মণ-এর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেওয়া হয় এবং আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই মঈনুলকে আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু দণ্ডবিধির ২০১/৩৪ ধারায় (আলামত নষ্ট, সত্য গোপন, অসহযোগিতা) অভিযুক্ত আসামি দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আবদুল মোতালেব, এসআই মাহতাব, এসআই স্বপন চক্রবর্তী, ডা. মহসীন, এএসআই মতিয়ার, এসআই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের খালাস দেন।
চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর, ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। রংপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে মামলার অন্যতম আসামী এএসআই মইনুল হক ও কনস্টেবল আব্দুস সাত্তারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ২০০৪-এর ১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় এবং একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মণকে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।

ইয়াসমিনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে এবং এধরণের অপকর্মের ভূক্তভোগী যেন আর কোনো নারীকে না হতে হয় তাই, ২৪ আগস্টকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। দেশের নারীর সুরক্ষায় রয়েছে বিভিন্ন আইন। তবুও সমাজে বন্ধ হচ্ছে না নারীর প্রতি সহিংসতার সবচেয়ে কুৎসিত ও বিকৃত অপরাধ ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি ধর্ষকের কাছ থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ-এই আমাদের কাম্য।
সম্পাদনায়ঃ হাবিবা সুলতানা

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles