সর্বশেষ

29.8 C
Rajshahi
সোমবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৪

পদ্ম ”পা” চীনের ভয়ংকর কুপ্রথা

নাসরিন ইসলামঃ এ আধুনিক যুগে এসে, গত যুগের প্রচলিত হয়ে আসা কিছু প্রথা আমরা কুপ্রথা হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষমতা অর্জন করেছি। আজ আমি একটি ভিন্নধর্মী টপিক নিয়ে আপনাদের জানাতে এসেছি। বর্তমান পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলোর অন্যতম ১টি দেশ চীন । আর এই উন্নত দেশটিতেই একটি কুপ্রথা প্রচলিত ছিলো। চীন দেশটির কথা ভাবলেই আমাদের সবার মনে আসে তাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধি। চীন সম্পর্কে আপনার আমার অনেক কিছুই জানা আছে কিন্তু তারপরেও অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। তেমনি কিছু অজানা তথ্য আজ আপনাদের জানাবো।

সময়টা ছিলো ১০ শতকের পরের দিকে চীনে তখন সঙ বংশের রাজত্ব ছিলো। রাজ দরবারে এক নর্তকি নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন তখন তৎকালীন রাজা নর্তকির পা দেখে বিমোহিত হয়ে যান। সে নর্তকির পা গুলো ছিলো একটু ছোট ছোট। ব্যাস তারপর থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিলো অভিজাত মেয়েদের পা ছোট হওয়ার আভিজাত্যিক প্রথা।বড় ঘরে মেয়েকে বিয়ে দিতে হলে মেয়েদের পা ছোট হতেই হবে এমন চিন্তায় তারা ছোট ছোট মেয়েদের পা ছোট রাখতে একটি কুপ্রথার প্রচলন করে। মূলত ছোট বেলা থেকেই তাদের পা গুলোকে খুবই নির্মম ভাবে মুড়ে ভাঙ্গা হতো। ধনী পরিবারে বিয়ে দিতে মেয়েদের পা ছোট রাখার বিষয়টি সাধারন মানুষের মধ্যে প্রচলিত হয়ে যায়। পা ছোট হলে মেয়েদের আরও আর্কষনীয় লাগে, তাই মেয়েদের পা গুলোকে ৪” (চার ইঞ্চি) মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা শুরু হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক পা ছোট করে রাখার প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পূর্ণ করা হতো। তিন থেকে চার বছর মেয়েদের মা বা দাদিরা সাধারণ নত এ কাজ গুলো করতেন।

প্রথমত তাদের পা গুলো কে উষ্ণ ও ভেষজ বা পশুর রক্তে ভিজিয়ে রাখতো যেন পা গুলো একটু নরম হয়ে যায়। তারপর বুড়ো আঙুল বাদ দিয়ে বাকি আঙুলগুলো ভেঙে মুচড়ে পায়ের নিচের দিক দিয়ে শক্ত কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হত। হাড় ভাঙার যন্ত্রণায় শিশুরা কান্না শুরু করে দিত।কিন্তু তারপরেও এর ভেতর দিয়ে তার পা শক্ত করে বাধা থাকতো। এখানেই শেষ নয় ব্যান্ডেজ গুলো এমন ভাবে শক্ত করে বাধা হতো যেন ভাঙা হাড় গুলো পরবর্তীতে কখনও জোড়া না লাগে। এবং বিকৃত অবস্থায় পায়ের হাড়গুলো যাতে বেড়ে উঠতে না পারে। পা ছোট রাখার এই প্রকৃয়াটি তার সাথে বছরের পর বছর ধরে চলতো এবং এই পা ব্যান্ডেজ অবস্থায় তাকে অন্যান্য সকল কাজ করতে হতো। মাঝে মাঝেই তাদের সাথে ভয়ংকর সংক্রামক ঘটনা ঘটতো। তাদের পায়ের ব্যান্ডেজ বাধা অবস্থায় রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে পায়ে পচন ধরতো। আর এই পচন ধরলে তারা খুশিই কারন পচন ধরলে পায়ের নখ গুলো আপনা আপনি খসে যেত ফলে পায়ের আকৃতি আরও একটু ছোট দেখাতো। কেও কেও তো পায়ের ব্যান্ডেজ করার সময় ইচ্ছে করেই পায়ের ভেতর কাঁচের টুকরো বা আলপিন দিয়ে রাখতো যাতে করে পা ব্যান্ডেজের পর কঁচের টুকরো বা আলপিন পায়ে ঢুকে যেত। তাতে ক্ষত তৈরি হয়ে দ্রুত পায়ে পঁচন ধরে যেত এবং নখ গুলো খসে যেত ফলে পায়ের সাইজ আরও ছোট হতো। চীনের নারীদের পায়ের এ স্বাভাবিক পরিবর্তনের এই চর্চাকে একটি নাম দেওয়া হয়েছিলো Foot binding বা পা বাধা। তবে এমন প্রথায় আকৃষ্ট ব্যাক্তিরা এর একটি শৈল্পিক নাম দিয়েছিলো তা হলো Lotus feet বা পদ্ম পা।

চীনাদের এই পা বাধার এই প্রথাটির প্রভাব ছিলো একেবারেই চমকে দেওয়ার মত। কোন মেয়ের পা এমন না হলে সেই পরিবারকে বিভিন্ন ভাবে হেয় ও লজ্জিত করা হতো।কোন মা ই সন্তানের এমন কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। তবুও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের এমন কষ্ট সহ্য করতেই হতো। কারন তখন কষ্টের চেয়ে সমাজে মেয়ের সম্মান, সৌন্দর্য ও অভিজাত ঘরে বিয়ে এসবই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ১৯ শতকে সাধারন পরিবারে প্রায় ৪০% নারীদের পা ছিলো এমন এবং অভিজাত পরিবারে তা ছিলো প্রায় ১০০%। পরবর্তীতে ১৬৪৪ সালের দিকে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। সে সময় মান চু চিং বংশ ক্ষমতায় এলে এ পা ছোট করার বিষয়টি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে তা কেবল মান চু চিং বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। এর আরো পরে অনেক আন্দোলন ও সমাজ সংস্কারকরা এর বিরোধিতা করেন।পরবর্তী তে ১৯১২ সালের দিকে রাজবংশ ভেঙে প্রজাতন্ত্র শুরু হলে দেশটির সরকার এ পা ছোট করার প্রথাটি বাতিল করেন। এমনকি এমন প্রথা যেন গোপনেও না হয় সেই জন্য তিনি সরকারী একটি দল গঠন করেন তাদের কাজ ছিলো তারা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পা পরীক্ষা করতেন। তারপরও কিছু কিছু যায়গায় এমন পা ছোট করার প্রথার প্রচলন ছিলো তবে তা অত্যান্ত গোপনে।

সম্পাদনাঃ সাদী ইউসুফ ও হাবিবা সুলতানা ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles